মেনু নির্বাচন করুন
পাতা

ভাষা ও সংস্কৃতি

মানুষের প্রধান ভাষা - বাংলা

অত্র ইউনিয়ন পরিষদের অধিন মানুষ মুসলিম ধর্ম অনুসারী তবে কিছু হিন্দু ধর্মী লোক আছে। তাহারা নিজ নিজ ধর্ম ও

সংস্কৃতি পালন করে।

ভাষা আল্লাহ তা‘আলার নেয়ামতের অফুরন্ত ভাণ্ডার ঘিরে রেখেছে সৃষ্টিকুলকে। তার কোনো নেয়ামতই গুরুত্বের দিক থেকে কম নয়। তবে কিছু কিছু নেয়ামত প্রয়োজন ও অপরিহার্যতার বি চারে একটু বেশিই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়। মানুষের মনের ভাব প্রকাশের জন্য স্রষ্টা তাদের যে ভাষার নেয়ামত দান করেছেন সেটাও এর অন্তর্ভূক্ত। মনের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম আকুতিকে প্রকাশ করার জন্য আমরা মুখের মাধ্যমে অর্থপূর্ণ যে শব্দ বের করি সেটাই ভাষা। ভাষাকে আল্লাহ তা‘আলা তার অন্যতম নিদর্শন হিসেবে অভিহিত করেছেন। আল কুরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘তার এক নিদর্শন হলো, তোমাদের রং, ধরণ এবং ভাষার ভিন্নতা।’ (সূরা রূম: ২২) ভাষা ছাড়া মানবসভ্যতা অচল। বাকহীন নিথর কোনো ভূখণ্ডে বেঁচে থাকা কতটা যে দুর্বিষহ তা বোঝানো মুশকিল। মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব এবং মানবসভ্যতাকে ছন্দময় করে তোলার জন্যই আল্লাহ তা‘আলা আশরাফুল মাখলুকাত তথা মানুষকে দান করেছেন ভাষার নেয়ামত। সব প্রাণীরই স্ব স্ব ভাষা আছে, নিজেদের মধ্যে ভাব-বিনিময়ের মাধ্যম জানা আছে। কিন্তু মানুষের ভাষার মতো এত স্বাচ্ছন্দ্য, সহজাত ও সমৃদ্ধ ভাষা অন্য কোনো প্রাণীর নেই। এখানেই মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব, সেরা জীব হওয়ার মাহাত্ম্য। প্রথম মানুষ হযরত আদমকে (আ.) সৃষ্টি করার পর সর্বপ্রথম তাকে ভাষা শিক্ষা দিয়েছেন। আল কুরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘হযরত আদমকে সৃষ্টি করার পর যত ভাষা দুনিয়াতে আছে সবকিছুর জ্ঞান তাকে তিনি দান করেছেন।’ (সূরা বাকারা : ৩১) অন্যত্র এরশাদ হয়েছে, ‘মানব জাতিকে তিনি সৃষ্টি করেছেন এবং বর্ণনা করার জ্ঞান দিয়েছেন।’ (সূরা আর রহমান: ৪) আল্লাহর কুদরতি নেজাম হলো, প্রতিটি মানুষই ভাষার নেয়ামতসহ জন্মগ্রহণ করে। দুনিয়ার আলো-হাওয়ায় চোখ খুলেই মায়ের ভাষার সঙ্গে পরিচিত হয়। এক সময় নিজেও মায়ের মতো করে মায়ের ভাষায় কথা বলা এবং স্বাচ্ছন্দ্যে মনের ভাব প্রকাশে পারঙ্গম হয়ে ওঠে। এভাবেই মানবসভ্যতার বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে বিকশিত হয়েছে ভাষা। আর মানুষের ভিন্নতার কারণে ভাষায়ও এসেছে ভিন্নতা ও বৈচিত্র্য। সময়, স্থান ও মানুষের এ বিচিত্রতার কারণেই পৃথিবীতে অস্তিত্ব লাভ করেছে কয়েক হাজার ভাষা। মর্যাদার বিচারে সব ভাষাই গুরুত্বপূর্ণ। তবে প্রত্যেকের কাছে তার মায়ের ভাষা সেরা। শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও ত্যাগে মায়ের ভাষার সমকক্ষ আর কোনো ভাষা নেই। মহান স্রষ্টা নিজেও মাতৃভাষাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। যুগে যুগে মানুষের হেদায়াতের জন্য তিনি যত নবী-রাসূল পাঠিয়েছেন তাদের প্রত্যেককে মাতৃভাষায় যোগ্য ও দক্ষ করে পাঠিয়েছেন। যখন যে কিতাব অবতীর্ণ করেছেন তা নবীদের মাতৃভাষায় করেছেন। মহাগ্রন্থ আল কুরআনে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘আমি সব রাসূলকেই তাদের স্বজাতির ভাষাভাষী করে পাঠিয়েছি, যাতে তারা আমার বাণী স্পষ্টভাবে বোঝাতে পারে’। (সূরা ইবরাহিম: ৪) নবীদের জীবনী পর্যালোচনা করলে জানা যায়, তারা প্রত্যেকেই ছিলেন মাতৃভাষার পণ্ডিত। তাদের ওপর অবতীর্ণ কিতাবগুলোও ছিল স্বজাতীয় ভাষায়। যেমন হযরত দাউদের (আ.) প্রতি অবতীর্ণ যবুর ছিল গ্রীক ভাষায়, হযরত মুছা (আঃ)-এর প্রতি অবতীর্ণ তাওরাত ছিল হিব্রু ভাষায়, ঈসার (আ.) ইনজিল ছিল সুরয়ানি ভাষায়, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহর ((সাঃ)) কুরআন আরবি ভাষায়। হাদীসের বাণী, ‘আমি আরবের মধ্যে সবচেয়ে বিশুদ্ধভাষী।’ (হাদীসটি শব্দগতভাবে সহীহ না হলেও অর্থের দিক থেকে বিশুদ্ধ) প্রাতিষ্ঠানিক কোনো জ্ঞান না থাকার পরও আল্লাহর রাসূলের মুখনিসৃত কথাগুলো ছিল ভাষাশৈলীর দৃষ্টিকোণ থেকে ভাষা-সাহিত্যের মানদণ্ডে অত্যন্ত উঁচুমাপের। আজও আল্লাহর রাসূলের মুখ দিয়ে বের হওয়া হাদীসগুলো সাহিত্যের সমৃদ্ধ ভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত। প্রত্যেক নবী-রাসূলের ভাষাকেই আল্লাহ তা‘আলা সুমিষ্ট ও সাবলীল করেছিলেন, যাতে লোকেরা সহজেই বুঝতে পারে। আর দাওয়াতে দ্বীনের কৌশলও হলো সুমিষ্ট ও বোধগম্য ভাষায় দাওয়াত উপস্থাপন করা। এজন্য একজন দা‘ঈর বড় গুণ হলো, তার মাতৃভাষায় যথার্থ যোগ্যতা হাসিল করা। আমাদের মাতৃভাষা বাংলা নিয়ে আমরা গর্বিত। পৃথিবীর অন্যতম সমৃদ্ধ ও ঐতিহ্যমণ্ডিত ভাষাভাষী আমরা। গর্বের ধন এ ভাষার জন্য আমাদের রক্ত ঝরাতে হয়েছে, প্রাণ বিসর্জন দিতে হয়েছে। বিরল এ সম্মানের অধিকারী পৃথিবীর আর কোনো ভাষাভাষী নেই। মুসলিম অধ্যুষিত বিশাল এ জনপদের ভাষা হিসেবে বাংলার সঙ্গে ইসলামী ভাবধারা ও আবহ আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে। উৎপত্তিগতভাবে যাই হোক, মুসলিম সমাজে প্রচলিত ভাষাই মুসলমানদের ভাষা। সে ভাষা মায়ের মতোই আপন, গভীর মমতায় নিবিষ্ট। নিষ্ঠতা ও আন্তরিকতার সঙ্গে সে ভাষা চর্চা করলে তা ইবাদত হিসেবেই গণ্য হবে। কোনো নবী বা আসমানি কিতাব যদি এ জনপদে অবতীর্ণ হতো তাহলে এ কথা নিশ্চিতভাবে বলা যায়, তা বাংলাতেই হতো। স্রষ্টার দান হিসেবে ভাষা সবই সমান। বিশেষ কোনো কারণে কোনো কোনো ভাষা মহীয়ান হয়ে ওঠে। যেমন আরবি ছিল জাহেলি যুগের বর্বর মানুষদের ভাষা; আবু জাহেল ও আবু লাহাবদের ভাষা। কিন্তু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ ((সাঃ)) এবং পবিত্র কুরআনের স্পর্শ পেয়ে সে ভাষা শ্রেষ্ঠত্বের শীর্ষে পৌঁছে গেছে। অবহেলিত ও ঐতিহ্যহীন অনেক ভাষা চর্চার ব্যাপকতার কারণে সমৃদ্ধ ভাষায় পরিণত হয়েছে। প্রত্যেক ভাষাভাষীর দায়িত্ব হলো, নিজ নিজ মাতৃভাষাকে সম্মানের সাথে চর্চার মাধ্যমে সমুজ্জ্বল করে তোলা। আমাদেরও উচিত হাজার বছরের ঐতিহ্যমণ্ডিত প্রিয় ভাষা বাংলাকে বিশ্বের দরবারে মহীয়ান করে তোলার জন্য আকুল প্রয়াস চালানো। তবেই মাতৃভাষার প্রতি আমাদের দায়িত্ববোধ পালিত হবে; স্রষ্টার নেয়ামতের যথার্থ কদর করায় আমরা বিশেষভাবে মূল্যায়িত হব। তাই এই ভাষার মর্যাদা আরো উচ্চকিত করতে হলে আমাদের সবাইকে শুদ্ধ ভাষায় কথা বলতে হবে এবং বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার প্রয়োজনে সর্বস্তরে বাংলাভাষার ব্যবহার করতে হবে। তাহলেই ৫২-র ভাষা শহীদদের আত্মত্যাগ সার্থক হবে। আমরা সবাই শুদ্ধ ভাষায় কথা বলবো এবং অন্তত একজন নিরক্ষর লোককে বাংলা ভাষার অক্ষর জ্ঞান দান করবো।

ছবি



Share with :

Facebook Twitter